এই দিনে

ভালোবাসার ব্যাখ্যা

ভালোবাসায় যেমনটি রয়েছে আবেগের ভূমিকা, তেমনি রয়েছে হরমোনসহ অনেক রাসায়নিক উপাদানের ক্রিয়া-বিক্রিয়ার গোপন চাল।

  • প্রেম বা ভালবাসা হলো আমাদের মস্তিষ্কের থ্যালামাসের একধরনের রাসায়নিক অবস্থা | যার জন্য একাধারে দায়ী আমাদের জিন। প্রেমের প্রথমদিকে হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, গাল – কান লাল হয়ে যাওয়া, হাতের তালু ঘেমে যাওয়ার উপসর্গ গুলো দেখা যায়; বিজ্ঞানীদের মতে সেসবের পেছনে দায়ী হলো ডোপামিন, নরেপিনেফ্রিন হরমোন।
  • ইস্ট্রোজেন হরমোন। এটিকে স্ত্রী হরমোন বলা হয়। আর একটি হচ্ছে টেস্টোস্টেরন বা পুরুষ হরমোন। নারী-পুরুষের শারীরিক গড়ন নির্ভর করে এ দুটি হরমোনের আনুপাতিক হারের ওপর। শারীরিক গড়ন, কাম-তৃষ্ণা ছাড়াও রোমান্টিক আবেগ অনুভূতির সঙ্গেও রয়েছে ইস্টোজেন এবং টেস্টোস্টেরনের গোপন খেলা। রাসায়নিক উপাদানের বিক্রিয়ার ফলে প্রেম-ভালোবাসা এবং মানবিক তীব্র আবেগীয় অনুভূতিগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়।
  • মস্তিষ্ক সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা থাকে। এর একেক অংশের কাজ একেক রকম। মস্তিষ্কের ডান অংশ সাধারণত মানুষের আবেগ, অনুভূতি, ক্রিয়েটিভিটি, ভাবনা ইত্যাদি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। মস্তিষ্কের বাম অংশ লজিক, কারন, প্ল্যান, ব্যাখ্যা ইত্যাদি বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে। তাই বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় মস্তিষ্কের ডান অংশই ভালোবাসাজনিত যাবতীয় বিষয় বহন করে থাকে।ভালোবাসার প্রাথমিক পর্যায়ে ভালোবাসা জনিত কারনে সচল থাকা মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশে ডোপামিন প্রবাহিত হয়ে থাকে। এটি ভালোবাসাকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যায়।
  • যারা নতুন নতুন প্রেমে পড়ে তাদের দেহে সেরেটোনিন নামক এক প্রকার হরমোন উৎপন্ন হওয়া কমে যায়। সেরেটোনিন আমাদের মন খুশি রাখার জন্য দায়ী একটি হরমোন।যার ফলে মন কিছুটা উদাস থাকে বা বিষণ্ণতায় ভোগে!
  • ভালোবাসার প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষের মাঝে ৩টি বিষয় বেশি কাজ করে।কাছে পাওয়ার ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা আর ভবিষ্যৎ লক্ষ্য। কাছে পাওয়ার ইচ্ছার জন্য আমাদের সাধারণ সেক্স সেল, ইস্ট্রোজেন এবং টেস্টোস্টেরন দায়ী। ভবিষ্যৎ লক্ষ্য আমাদের পুরো দেহ জুড়েই অবস্থান করে কেননা এর জন্য একগুচ্ছ এড্রেনালিন দায়ী। এই রাসায়নিক পদর্থ মানুষকে প্রতিকুল পরিস্থিতি মোকাবেলা ও দায়িত্ব নিতে সাহায্য করে। এই একই রাসায়নিক পদার্থ ভালোবাসায় প্রথম দিকে মানুষের শ্বাসের হার এবং ঘামের হারও বৃদ্ধি করে থাকে।
  • যখন কোনো মানুষ প্রেম বা ভালোবাসায় জড়ায় তখন সে তুলনামূলক শান্ত থাকে। বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলতে গেলে সে সময়টা মানুষের প্যারাসিম্পেথিটিক অ্যাক্টিভিটিস বাড়ে। অর্থাৎ সে তখন অন্যের সঙ্গে ভালো ব্যবহার ও সদাচরণ বাড়িয়ে দেয়। অনেক সময় বুকের ধড়ফড় কমে। এতে করে ভালো ঘুম হয়। সব মিলিয়ে আচার আচরণে পরিবর্তন আসে। এমনকি মনের অজান্তে গুনগুনিয়ে গান গাইতে থাকে। তিনি আরও বলেন, ভালোবাসায় জড়ালে বা কাউকে মনেপ্রাণে ভালোবাসলে এক কথায় প্রেমে পড়লে ব্রেন থেকে পিরোটরিন ও অ্যান্ডোরফিনস নিঃসরিত হয়।ফলে কাজকর্মে সতেজতা পাওয়া যায়। এ কারণে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ভালোবাসা জরুরি।
  • মাঝে মাঝে দেখা যায় কারো কারো প্রেমের আবেগ কমে যায়। তার কারণ মস্তিষ্ক থেকে ওই হরমোনগুলো নিঃসৃত হয় না। আবার এও দেখা গেছে যে কোনো মানুষের শরীরে কৃত্রিমভাবে এই হরমোন রসায়ন প্রয়োগ করা হলে তাদের মাঝে সেই প্রেমের অনুভূতি হয়। তীব্র প্রেমের সময়গুলোতে কেন দ্বিগবিদ্বিগশুন্য নেশার ঘোর লাগা ভাবের উদয় হয়, কেন বুদ্ধিশুদ্ধি একেবারেই লোপ পায়? আমাদের মস্তিস্কে অ্যামাগডালা বলে একটি বাদাম আকৃতির প্রত্যঙ্গ আছে। সেটা এবং মস্তিস্কের কর্টেক্সের কিছু এলাকা আমাদের ভয়-ভীতি নিয়ন্ত্রণ করে, অকস্ম্যাৎ বিপজ্জনক পরিস্থিতি আসলে আমাদের আগাম সতর্ক করে দিতে পারে। দেখা গেছে প্রেমের রোমাঞ্চকর এবং উত্তাল সময়গুলোতে মস্তিকের এ এলাকাগুলোর কাজ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভয় ভীতি কিংবা ‘ক্রিটিকালি’ চিন্তাকরার ব্যাপার স্যাপারগুলো পুরোপুরি লোপ পায় তখন।
  • গবেষনাগুলোয় দেখা গেছে যখন আমরা এমন কারো চেহারা দেখি, যাদের আমরা খুব গভীর এবং তীব্র আবেগের সাথে ভালোবাসি, যাদের প্রেমে আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি, আমাদের ব্রেনের কিছু নির্দিষ্ট জায়গা বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এবং ব্যপারটা ঘটে নারী পুরুষ সবার ক্ষেত্রেই।
  • ভালোবাসার আবেগ যে তীব্র ‍আনন্দ, সুখানুভুতি বা ইউফোরিয়া, বা প্রশান্তির অনুভুতি সৃষ্টি করে তা বর্ণনাতীত। এবং ব্রেনের যে জায়গাগুলো এ ধরনের রোমান্টিক অনুভুতির সাথে সংশ্লিষ্ট সেখানে মুলতঃ অতি উচ্চ মাত্রায় ব্রেনের রিওয়ার্ড মেকানিজমের, কামনা, আসক্তি, ইউফোরিক অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট নিউরোমড্যুলেটর, ডোপামিন (dopamin) থাকে। এবং অন্য দুটি মডুলেটর যারা রোমান্টিক ভালোবাসার সাথে জড়িত, অক্সিটোসিন এবং ভেসোপ্রেসিন (নীচে বর্ণনা) এর মত ডোপামিন নিঃসরন করে, হাইপোথ্যালামাস, এটি ব্রেনের ভিতরের দিকে থাকে, এবং এর গুরুত্বপুর্ন কাজটি হলো স্নায়ুতন্ত্র এবং আমাদের এন্ডোক্রাইন (অন্তক্ষরা গ্রন্হিদের যে তন্ত্রটি আমাদের শরীরের নানা ধরনের হরমোন তৈরী করে) সিস্টেমের মধ্যে যোগসুত্র তৈরী করা। যেহেতু এটি সেই বিবর্তিত ব্রেনের রিওয়ার্ড সিস্টেমের অন্তর্গত অঞ্চল, এই অংশগুলো কিন্ত‍ু সক্রিয় হতে পারে যদি কেউ মাদক, যেমন কোকেইন ( যা নিজেই এধরনের উৎফুল্ল মানসিক অবস্থা তৈরী করতে পারে) গ্রহন করে। ডোপামিন আমাদের ব্রেনে নি:সরিত হলে আমরা একটা ভালো লাগার (Feel good) অনুভুতি অনুভব করি। আর ডোপামিন শুধুমাত্র সম্পর্ক গড়ার স্নায়বিক প্রক্রিয়ার সাথে অন্তরঙ্গ ভাবে জড়িত তা কিন্ত‍ু না, এটি যৌনতা বা সেক্স এর সাথেও জড়িত; যা কোন রোমান্টিক সম্পর্কের পরিনতির একটি সন্তুষ্ঠিকর এবং ভালো লাগার অনুশীলন বা কাজ হিসাবে গন্য করা হয়। ডোপামিন বেড়ে গেলে ব্রেনে যুগপৎ আরেকটি রাসায়নিক পদার্থর পরিমান কমে যায়, সেটি হলো আরেকটি নিউরোমডুলেটর সেরোটোনিন (5-HT বা 5-Hydroxytryptamine), যা জড়িত আমাদের মুড (মেজাজ বা মানসিক অবস্থা) এবং অ্যাপেটাইটের (ক্ষুধা) সাথে। বিভিন্ন স্টাডিতে দেখা গেছে রোমান্টিক ভালোবাসার শুরুর দিকে সেরোটনিনের পরিমান যে পর্যায়ে কমে যায়, সেরকম দেখা যায়  অবসেসিস কমপালসিভ ডিসওর্ডার (Obsessisve Compulsive Disorder) এর আক্রান্ত রোগীদের যেমনটা সাধারণত দেখা যায়। ভালোবাসা, সর্বোপরি একটি অবসেশনতো বটেই, এবং এর প্রথম স্টেজগুলো সাধারনতঃ এটি সমস্ত চিন্তাকে প্যারালাইজ করে শুধু একজন ব্যাক্তি বিশেষের দিকেই চিন্তাকে প্রবাহিত করে, সেই বিশেষ একজনই আমাদের সব ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
  • যখন আমরা গভীরভাবে ভালোবাসি, আমরা অন্য মানুষকে যেমন ক্রিটিক্যালী বিচার করি, সেটাকে আমাদের প্রিয় মানুষের ক্ষেত্রে স্থগিত করে রাখি। অনেক সময়ই আমরা কারো সম্বন্ধে আমাদের ক্রিটিক্যাল জাজমেন্ট স্থগিত রাখি, যখন তাদের সাথে আমাদের একটি বিশ্বাসের বন্ধন তৈরী হয়, এছাড়া মায়ের সাথে তার সন্তানের গভীর বন্ধনতো বটেই। একারনে এখানে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, সেই প্রচলিত কথা: `Love is Blind’ ।
  • যখন মাঝে মাঝে কারো ভালোবাসার মানুষ বাছাই এ পছন্দ দেখে আমরা অবাক হই, বৃথাই নিজেদের জিজ্ঞাসা করি কেমন করে তারা এমন একজনকে পছন্দ করতে পারলো? কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে কিনা? আসলেই তারা কান্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। ভালোবাসা প্রায়শই কোন যুক্তি গ্রাহ্য করে না, কারন আমাদের ব্রেনেই যৌক্তিক বিচার বিবেচনা স্থগিত হয়ে থাকে বা যেভাবে দৃঢ়তার সাথে অন্য কোন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার করা হয়ে থাকে সেভাবে ব্যবহৃত হয় না।
  • ভালোবাসায় আচ্ছন্ন কেউ যখন তাদের ভালোবাসার মানুষের প্রতি সব ক্রিটিক্যাল জাজমেন্ট স্থগিত করে রাখেও, তারা কিন্তু অন্য সব কিছুর ব্যাপারে তাদের বিচার ক্ষমতা স্থগিত করে রাখে না, তারা কিন্তু পারে, যেমন, কোন বই বা কোন বৈজ্ঞানিক গবেষনার গুনগত মান সম্বন্ধে তাদের জাজমেন্ট ক্ষমতা প্রয়োগ করতে। তারা তাদের ভালোবাসার মানুষ ছাড়া আর যে কোন কারোর সম্বন্ধে তাদের ’থিওরী অব মাইন্ড প্রয়োগ’ করতে সক্ষম। এই জাজমেন্টটা সাসপেসনশন হয় সিলেকটিভ ভাবে, যা ভালোবাসার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট স্নায়ৃ সংযোগ এবং ব্রেনের কর্মকান্ডের পক্ষেই যুক্তি দেয়।
  • মায়ের ভালোবাসার ক্ষেত্রেও বিচার বুদ্ধি বা জাজমেন্ট করার ক্ষমতাটি নানা মাত্রায় স্থগিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ মারা তাদের বাচ্চাদের ব্যাপারে বেশী একটু পশ্রয় দিয়ে থাকেন এবং স্বভাবত সে কারনে নিজেদের সন্তানের ভুলটা সহজে চোখে পড়ে না।
  • আমাদের ভালোবাসার মানুষ কেমন হবে সেই সম্বন্ধে আসলেই যে আমরা একটা মানসিক ধারনা বা কনসেপ্ট ধারন করি.এটা অবশ্য বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, বেশীর ভাগ মানুষেরই সে কেমন ধরনের মানুষকে ভালোবাসবে সে সম্বন্ধে তার একটা নিজস্ব পছন্দ গড়ে ওঠে, সে কারনেই আমাদের সম্ভাব্য প্রেমিক প্রেমিকার ধারনা বা কনসেপ্ট,  অর্থাৎ যে ধরনের মানুষদের সাথে প্রেমে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী। এই প্রেফারেন্সটা কিন্তু নানা ধরনের হতে পারে. আর অবশই প্রভাবিত হয় অনেক কারনে, যাদের মধ্যে, বাবা মার প্রভাব, সাংস্কৃতিক কিছু প্রবনতা, এবং কেমন মানুষের সাথে তাদের পরিচয় হয়েছে ইতিমধ্যে এবং সেই অভিজ্ঞতাগুলো ইত্যাদি। একটি সাম্প্রতিক গবেষনা চেষ্টা করেছে মেয়েদের গড়পড়তা কোন ধরনের পুরুষের প্রেমে পড়ার সবচেয়ে বেশী সম্ভাবনা থাকে; দেখা গেছে সেই পুরুষটি মসৃন চামড়ার সাদামাটা একজন মানুষ, অনেকে যে ধরনের অতি পুরুষালী বা ম্যাচো পুরুষদের মেয়েদের পছন্দ বলে মনে করেন, সে রকম কিছু থেকে অনেক ভিন্ন। পছন্দের এই কাল্পনিক বা ভার্চুয়াল পুরুষটির সবচেয়ে কাঙ্খিত গুনাবলীগুলো শুধু মাত্র তার যৌন আকর্ষনীয় ক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট না, বরং সেই বৈশিষ্টগুলোও গুরুত্বপুর্ন যা ইঙ্গিত করে তার একটি কেয়ারিং মানসিকতা আছে।
  • কামনা থেকে সৌন্দর্য আর ভালোবাসার অবস্থান খুব একটা দুরে না,আর বেশীর ভাগ তীব্রতম ভালোবাসার সাথে দৃঢ় ভাবে জোড় বেধে আছে যৌন বাসনার। কারন এই দুটি অভিজ্ঞতাই ব্রেনের একই অংশ শেয়ার করে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন একটি আকর্ষনীয় চেহারা,যৌন উত্তেজনা এবং সেই সাথে ভিজুয়াল সৌন্দর্য এর কোন অভিজ্ঞতায় ব্রেনের এমন কিছু অংশকে জড়িত করে যার নাম অরবিটো ফ্রন্টাল কর্টেক্স।

তথ্যসুত্রঃ  

https://kmhb.wordpress.com/2011/11/08/%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A7%8B%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%BE-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%89%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A7%8B%E0%A6%B2%E0%A6%9C%E0%A7%80/

 

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *