এই দিনে

নারী দিবস

নারী দিবসঃ

এবারের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়: সময় এখন নারীর: উন্নয়নে তারা বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরের কর্ম-জীবনধারা (Time is Now: Rural and urban activists transforming women’s lives)

মানুষ হিসেবে অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়েই একসময় আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন শুরু হয়েছিল। সেই লড়াই এখনও চলছে। আপাতদৃষ্টিতে গত দুশ বছরে নারীর অনেক অর্জন আছে। তারপরও পুরুষতন্ত্রের সর্বগ্রাসী ও কর্তৃত্ববাদী সমাজ নারীকে সব সময়ই পেছনে টেনে ধরে রাখছে। ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে।

পুরুষরা নারীকে সন্দেহ করে। নারীকে নিয়ে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে ভোগে। আসলে সন্দেহ, ঈর্ষা, দ্বেষ, এ সবের তল খুঁজতে গেলে শেষ অবধি যেখানে পৌঁছে যাই আমরা, তার নাম ক্ষমতা। পুরুষতন্ত্র সেই ক্ষমতার তন্ত্র। ক্ষমতা পাওয়ার এই লোভ বা ফন্দিফিকির, এটাই পুরুষের মনে বুনে দেয় হিংসা, পুরুষকে করে তোলে সন্দিগ্ধচিত্ত। এই ক্ষমতার জোরেই নারীর গৃহস্থালি ভূমিকা হয় অস্বীকৃত। এই ক্ষমতার দম্ভেই চূর্ণ হয় নারীর অধিকার। হুমায়ূন আজাদ যথার্থই বলেছেন, ‘‘ক্ষমতাবান পুরুষ পছন্দ করে নম্র, অনুগত মেয়েকে। পুরুষ নারীকে দেখে দাসীরূপে, করে রেখেছে দাসী; তবে স্বার্থে ও ভয়ে কখনও স্তব করে দেবীরূপে’’।

নারীর প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ আসলে একটি পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া। যার উচ্ছেদ চাইতে হলে পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে। প্রতিবাদ করতে করতে, নিজেদের মানসিকতা পালটাতে পালটাতে আসবে সেই সম্মানের সাম্য। লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতায়নের নিয়ম যতদিন না পালটায়, পুরুষরা যতদিন মেয়েদের নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে ভাবা বন্ধ না করবে, আমাদের ততদিন এই ভয়ংকর অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পাবার কোনো উপায় নেই।

নারীকে অবদমিত করে রাখার মানসিকতা একটি সামাজিক ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া। একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়াও বটে। সামাজিক মননের পরিবর্তন না হলে সেই প্রক্রিয়া থামানো সম্ভব নয়। ক্ষমতাতন্ত্রকে পালটে দেবে– এমন ব্যক্তি সমাজে একেবারেই কম। তাছাড়া এটা একা কোনো ব্যক্তির কাজ নয়। কাজটা শুধু নারীরও নয়। কাজটা সমষ্টির।

সামাজিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন ধারায় দেখা যায়, নারী কোনও অংশেই পুরুষের পিছনে ছিল না। ফ্রান্সের প্যারি কমিউন, ফরাসি বিপ্লব, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনসহ ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে পুরুষের পাশেই নারীকে দেখা যায়। কিন্তু, কাঙ্ক্ষিত দাবি নারী সমাজ অর্জন করতে পারেনি। কর্মক্ষেত্রে নারীর মজুরি পুরুষের চেয়ে কম। আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের ২০০৯-এর এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে পুরুষের চেয়ে নারী ১৬ ভাগ পারিশ্রমিক কম পায়। অপর এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে নারীরা কাজ করছে শতকরা ৬৫ ভাগ।বিপরীতে, তার আয় মাত্র শতকরা দশ ভাগ। পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সংখ্যানুপাত প্রায় সমান। অথচ, দুনিয়ার মোট সম্পদের একশ` ভাগের মাত্র এক অংশের মালিক মেয়েরা।

মেয়েদের গৃহস্থালী কাজের আর্থিক স্বীকৃতি এখনও দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, তা অর্থনৈতিক মূল্যে অদৃশ্যই থাকে।

ইতিহাস:

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলে সরকারি লেঠেল বাহিনীর দমনপীড়ন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্ব প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হল। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ, জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের এক জন। এর পর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহাগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয়, ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল। অতঃপর ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় রাষ্ট্রসংঘ। এর পর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে।

অতীতে ৮ই মার্চ মূলতঃ ‘বিশ্ব শ্রমজীবি নারী দিবস’ হিসেবে পালিত হতো। দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক উন্নয়নে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্যই ‘শ্রমজীবি নারী দিবস’ হিসেবে দিনটি পালন করা হতো। এই দিনটি প্রথমদিকে সোস্যালিস্ট পলিটিক্যাল ইভেন্ট হিসেব পালিত হতো পূর্ব ইউরোপ, রাশিয়া এবং পূর্ববর্তী সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্লকে। পরবর্তীতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে দিবসটি রাজনৈতিকভাবে পালিত না হয়ে পুরোপুরি সামাজিকভাবে পালিত হতো। এই দিনে নারীকে তার পুরুষের পক্ষ থেকে জানানো হয় সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, বিনয় বা প্রেম। অনেকটাই মাদার্স ডে বা ভ্যালেনটাইন’স ডে’র আদলে দিনটি উদযাপিত হয়ে থাকে। পরবর্তীতে জাতিসংঘেও

১৯১১ সাল থেকে ৮ মার্চ দিনটিকে ‘নারীর সম-অধিকার দিবস’ হিসেবে পালিত হয় ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে এই সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী

১৯১১ সালের ১৯ মার্চ প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করা করা হয়। এই দিনে সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, অষ্ট্রিয়া ও জার্মানিতে লক্ষাধিক নারী মিছিল ও সমাবেশের মধ্য দিয়ে এ দিনটি উদযাপন করেন

১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকে

১৯৪৫ সালে সানফ্রান্সিসকোতে রাষ্ট্রসংঘ স্বাক্ষর করে ‘জেন্ডার ইকুয়ালিটি’ চুক্তিতে নারী অধিকারের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনায় রেখে

১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রসংঘ ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে অনেকটা এগিয়ে যায়

১৯৭৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষধে ৮ মার্চ নারী দিবস পালনের জন্য উত্থাপিত বিল অনুমোদন পায়

১৯৮৪ সালে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করে রাষ্ট্রসংঘ। ঐতিহাসিক সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রসংঘ এই সিদ্ধান্ত নেয়

২০০৯ সালে বিশ্বের ২৯টি দেশে সরকারি ছুটিসহ প্রায় ৬০টি দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালিত হয়েছে

২০১০ সালে বিশ্বজুড়ে নারী দিবস পালন করা হয়। অভূতপূর্ব সাড়া মেলে

ইতিহাসকে স্বীকৃতি:

 বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয় ৮ মার্চ। এর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, কিউবা, জর্জিয়া, গিনি-বিসাউ, ইরিত্রিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, লাওস, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনেগ্রো, রাশিয়া, তাজাকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উগান্ডা, ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, জাম্বিয়া।

চীন, মেসিডোনিয়া, মাদাগাস্কার, নেপালে শুধুমাত্র মেয়েরাই সরকারি ছুটি পায়।

আজকে নারী আন্দোলনকে লড়তে হবে সর্বগ্রাসী পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে, পুরুষকে সঙ্গে নিয়ে। যদিও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সেটা করতে পারাটা কঠিন। এই কঠিন কাজটিই আজকের নারী আন্দোলনের, একই সঙ্গে সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ।

কিন্তু নারী দিবস যখন মূলধারার উৎসবে পরিণত হল, রাষ্ট্র থেকে কর্পোরেট, সবাই যখন নারী দিবস নিয়ে মাতামাতি শুরু করল, তখন এই সব ‘অস্বস্তিকর’ প্রশ্নকে সরিয়ে রাখা হল। নারী দিবসের পিছনে যে মেয়েদের সামাজিক-অর্থনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটি আছে, সেটি সুচতুর ভাবে আমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হল,

কারণ মেয়েদের সামাজিক, অর্থনৈতিক বঞ্চনা আজও কমেনি।

আইন যা-ই বলুক, আজও নারী-পুরুষ সমান কাজে সমান মজুরি পায় না, মেয়েরা সম্পত্তির ভাগ চাইতে আজও কুণ্ঠা বোধ করে,

আপাতদৃষ্টিতে নারী এবং পুরুষের অনেক সমস্যা এক মনে হলেও তার ফল মেয়েদের জীবনে সব সময় বহুমাত্রিক। মেয়েদের এবং ছেলেদের অবস্থানে আজও অনেক ফারাক।

তা ছাড়া, বেশির ভাগ পুরুষের কাছেই এই বার্তা এখনও পৌঁছয়নি যে, নারীবাদ মানে নারী বনাম পুরুষের যুদ্ধ নয়। নারীবাদ ক্ষমতার সোপানতন্ত্র ভাঙতে চায়। ক্ষমতাবানের সঙ্গে ক্ষমতাহীনের লড়াই, প্রাতিষ্ঠানিক অচলায়তনের বিরুদ্ধে মুক্ত চিন্তার জেহাদই হল নারীবাদ। এই ক্ষমতার ভিত্তি হতে পারে লিঙ্গ, শ্রেণি, ধর্ম, জাতপাত, বর্ণ, যৌনতা, প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি বিভিন্ন পরিচিতি। নারীবাদী চিন্তা অনুযায়ী, পিতৃতন্ত্রে পুরুষও বঞ্চিত হয়, পুরুষকেও অনিচ্ছা-সত্ত্বে অনেক দায়ভার গ্রহণ করতে হয়।

নারীবাদ পুরুষকেও পিতৃতন্ত্রের বাঁধন থেকে মুক্তি দিতে চায়। নারীবাদ সমাজ-নির্মিত পৌরুষের ধারণার বিরুদ্ধে সরব। সেই জন্যই নারী দিবস পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার দিন, পুরুষের বিরুদ্ধে নয়। নারী দিবস শুধু নারীর দিন নয়, সমস্ত পিতৃতন্ত্রবিরোধী মানুষের উৎসব।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *